
ড: তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, এবং দাউদ ইব্রাহিম হাসান
“শোনো রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রহরীরা, শোনো রে এই ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সব শ্রান্ত
নাগরিক—তোমরা কি ভেবেছ বিগত দিনগুলোতে রুদ্ধদ্বার কক্ষের ভেতর যে ‘ভোট ডাকাতি’ চলেছে, তা কেবল
গুটিকয়েক মানুষের অপরাধ? না! ওটি ছিল ১৬ কোটি মানুষের সার্বভৌমত্বের ওপর এক সুপরিকল্পিত ও নিষ্ঠুর
আঘাত। ৫ই আগস্টের রক্তস্নাত বিপ্লবের পর আমরা যে ‘নতজানহীনু ’ বাংলাদেশের কথা বলছি, সেখানে কেন
আজো পোলিং অফিসারের কলমে অনিয়মের কালি লেপ্টে থাকবে? যখন একজন সাংবাদিক সত্য তুলে ধরতে
গিয়ে রক্তাক্ত হন, কিংবা একজন এজেন্টকে যখন তার নির্ধারিত কক্ষ থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া
হয়—তখন কি আর অবশিষ্ট থাকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সম্মান? জেগে ওঠো আজই! কারণ ত্রয়োদশ জাতীয়
নির্বাচন যদি বিগত দিনের ওই কলঙ্কিত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটায়, তবে জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বদরবারে
কেবল এক উপহাসের পাত্র হয়েই থাকব। সময় এসেছে ব্যালট বাক্সকে নিরাপদ করার, সময় এসেছে জনরায়ের
পবিত্রতা ফিরিয়ে দেওয়ার।”
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের পাতাগুলো উল্টালে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্যপট , যেখানে গণতন্ত্রকে বারংবার
শ্মশানে পাঠানো হয়েছে। বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন ছিল বিশ্বের চোখে কেবল বিতর্কিতই নয়, বরং
চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর ২০১৮ সালের সেই ঐতিহাসিক
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, জরিপকৃত ৫০টি আসনের মধ্যে ৪৭টিতেই অর্থাৎ ৯৪ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো
না কোনো ধরনের গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ ছিল। এই অনিয়মগুলো কেবল কোনো স্থানীয় মাস্তানের কাজ ছিল
না, বরং ছিল একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যর্থতা। পোলিং অফিসার থেকে শুরু করে প্রশাসনের উচ্চস্তর পর্যন্ত
যখন অনৈতিকতার চাদরে ঢাকা পড়ে, তখন সাধারণ মানষেুর ভোটাধিকার একটি খেলনায় পরিণত হয়।
আমাদের স্মৃতির পাতায় এখনো ভাসে সেই দিনগুলো, যখন ব্যালট পেপার আর ভোটের সীল ছিল এক বিশেষ
গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি।
মাঠ পর্যায়ের এই অনিয়মের সবচেয়ে বড় শিকার হতেন পোলিং এজেন্টরা। বিরোধী দলের এজেন্টদের কেন্দ্র
থেকে বের করে দেওয়াটা একসময় নির্বাচনের ‘অলিখিত নিয়মে’ পরিণত হয়েছিল। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদ
(JANIPOP)-এর ডাটা অনুযায়ী , বিগত তিনটি নির্বাচনে প্রায় ৩৯.৭ শতাংশ এজেন্ট কেন্দ্রে প্রবেশের কয়েক
ঘণ্টার মধ্যেই শারীরিক বা মানসিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়ে কেন্দ্র ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। যখন একটি কক্ষে
কোনো প্রার্থীর এজেন্ট থাকে না, তখন সেই কক্ষটি হয়ে ওঠে অনিয়মের স্বর্গরাজ্য। র্গপোলিং অফিসারদের একটি
অসাধুঅংশ তখন বুক ফুলিয়ে ব্যালট বাক্সে সীল মারার সুযোগ করে দেয়। এই যে এজেন্টের অসহায়ত্ব আর
পোলিং অফিসারের নির্লিপ্ততা—এটাই ছিল আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলে প্রথম কুঠারাঘাত। ত্রয়োদশ নির্বাচনে
যদি এই এজেন্টদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না যায়, তবে আমরা আবারো সেই অন্ধকার যুগেই ফিরে যাব।
দপুর গড়াতেই ছন্দপতন: বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচনে একটি অদ্ভুত ও বেদনাদায়ক প্যাটার্ন দেখা গেছে।
সকালবেলা টিভি পর্দায় যখন দীর্ঘ লাইন দেখা যায়, জনগণ মনে করে হয়তো এবার তাদের স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু
ঘড়ির কাঁটা দপুুর ২টা পেরোতেই উৎসবের মেজাজ রূপ নেয় বিষাদে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর
এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, নির্বাচনকালীন সহিংসতার প্রায় ৬৪.২ শতাংশই শুরু হয় নির্বাচনের দিন দপুুর
২টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যবর্তী সময়ে। ঠিক এই সময়টাতেই পেশিশক্তি আর কালো টাকার দাপট ব্যালট
বাক্সের দখল নিতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ যখন ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতেন, তখন শুনতে হতো—”আপনারভোট দেওয়া হয়ে গেছে।” এই একটি মাত্র বাক্য একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বকে মহুূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ করে
দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
তথ্যপ্রবাহকে রুদ্ধ করতে সাংবাদিকদের ওপর যে নারকীয় হামলা চালানো হয়েছে, তা আমাদের সাংবাদিকতার
ইতিহাসে এক বড় ক্ষত। সাংবাদিকরা যখন কোনো কেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণসহ তথ্য তুলে ধরতেন, তখন তাদের
ক্যামেরা ভেঙে দেওয়া হতো অথবা তাদের ওপর শারীরিক লাঞ্ছনা চলত। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস
(CPJ)-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে গত তিনটি নির্বাচনে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধার হার প্রায়
১৮.৭ শতাংশ বেড়েছে। সাংবাদিকরা আক্রান্ত হওয়া মানে হলো সত্যের কণ্ঠরোধ করা। আর যখন সত্যকে
আড়াল করা হয়, তখন অন্ধকার শক্তিগুলো ব্যালট বাক্স নিয়ে হোলি খেলায় মেতে ওঠে। এই যে সাংবাদিকদের
জিম্মি দশা, এটি আমাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে বারবার নিচুকরেছে। ত্রয়োদশ নির্বাচনে আমাদের এমন এক
পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারবেন, নতুবা গণতন্ত্র কখনোই
পূর্ণতা পাবে না।
রিটার্নিং অফিসারের নিস্পহৃতা ও প্রশাসনিক জালিয়াতি : সবচেয়ে বড় হতাশা তৈরি হয় তখন, যখন একজন
ভোটার বা প্রার্থী সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নিয়ে রিটার্নিং অফিসারের কাছে যান এবং সেখানে কোনো বিচার পান না।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, রিটার্নিং অফিসাররা অভিযোগ গ্রহণ করা তো দুরের কথা, অভিযোগকারীর সাথে
দেখা করাও প্রয়োজন মনে করেননি। এই প্রশাসনিক নিস্পৃহতাই অনিয়মকারীদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। অনেক
জায়গায় দেখা গেছে, সকাল থেকে পরিস্থিতি খুব ভালো থাকলেও ফলাফল ঘোষণার সময় হঠাৎ ম্যাজিকের মতো
জয়ী প্রার্থী পরাজিত হয়ে যান। সঠিক নিয়ম-শৃঙ্খলা না মেনে তড়িঘড়ি করে ফল প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক
সময় জয়ী প্রার্থীকে হার মানতে বাধ্য করা হয়েছে। গ্লোবাল রিফর্মিস্টর্মি কাউন্সিল ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী , গত
এক দশকে অন্তত ১১.৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার সময় ‘টেকনিক্যাল’ বা ভুলবশত জয়ী প্রার্থী
পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে।
এই ধরনের প্রশাসনিক কারচুপি কেবল একজন প্রার্থীর ক্ষতি করে না, বরং পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর
মানুষের আস্থার ভিত নাড়িয়ে দেয়। যখন একজন রিটার্নিং অফিসার তার শপথের কথা ভুলে গিয়ে কোনো
বিশেষ দলের হয়ে কাজ করেন, তখন তিনি কেবল একটি পদের অমর্যাদা করেন না, বরং কোটি মানষেুর
দীর্ঘশ্বাস নিজের ঘাড়ে নেন। বিগত নির্বাচনের ভিডিও ফুটেজগুলো এখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়ায়,
যেখানে প্রিসাইডিং অফিসারদের অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় অথবা সরাসরি ব্যালটে সীল মারতে
দেখা যায়। এই ছবিগুলো আমাদের বিশ্বদরবারে ছোট করেছে। তাই ত্রয়োদশ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারদেরজবাবদিহিতা হতে হবে সবচেয়ে কঠোর। যদি একটি ভুল ফলাফলও ঘোষিত হয়, তবে এর দায়ভার সংশ্লিষ্ট সকল
কর্মকর্ম র্তাকে বহন করতে হবে। নতুবা আমাদের এই ‘গণতান্ত্রিক উৎসব’ কেবল একটি প্রসহনে পরিণত হবে।
বিজয় পরবর্তী উন্মাদনা ও হারের গ্লানি তে জ্বলছে জনপদ: নির্বাচন শেষ মানেই কি শান্তি? বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপটে উত্তরটি বড় করুণ। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই বিজয়ীদের অতি-উল্লাস আর পরাজিতদের
প্রতিহিংসা পুরো সমাজকে এক বিশৃঙ্খলার মুখে ঠেলে দেয়। বিজয় মিছিলের নামে পরাজিত পক্ষের
কর্মী-সমর্থকদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো এক ঘৃণ্য সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। বিজয়ী দল
যখন মনে করে তারা এখন ধরাকে সরা জ্ঞান করতে পারে, তখনই শুরু হয় সাধারণ মানষেুর ওপর নিপীড়ন।
অন্যদিকে, পরাজিত দল যখন অনভবু করে যে নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠুছিল না, তখন তারাও হারের গ্লানি
সইতে না পেরে বিভিন্ন নাশকতামলকূ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। আইএলও (ILO) ও বিবিএস (BBS)-এর এক যৌথ
প্রতিবেদন বলছে, নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়
প্রতি নির্বাচনে।
এই যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, এটি আমাদের সামাজিক বননু কেই নষ্ট করে দিচ্ছে। সাধারণ মানষু যারা কেবল
ভোট দিতে এসেছিলেন, তাদের অনেককেই জীবন দিতে হয়েছে এই উন্মাদনার বলি হয়ে। এই চিত্রগুলো আমরা
আগে অনেক দেখেছি, কিন্তু ভবিষ্যতে আর কোনো মা যেন তার সন্তানকে হারানো শোক সইবার জন্য অপেক্ষা না
করে। ত্রয়োদশ নির্বাচন পরবর্তী সময়কালকে শান্তিময় করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে এক ‘মৌখিক চুক্তি’
থেকে বের হয়ে এসে কঠোর আচরণবিধির আওতায় আনতে হবে। বিজয় মানে অন্যকে অত্যাচার করার
লাইসেন্স নয়—এই সত্যটি আমাদের রাজনৈতিক মহলে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যদি ত্রয়োদশ নির্বাচনেও আমরা
এই প্রতিহিংসা থামাতে না পারি, তবে ৫ই আগস্টের আত্মত্যাগ অর্থহীন হয়ে পড়বে।
সুশঙ্খৃল ভোটই হোক মক্তিুক্তির দিশা: বিগত দিনের এই দগদগে ক্ষতগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয়
নির্বাচনকে একটি মডেল নির্বাচনে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। আমাদের আর কোনো ‘নিশিরাতের
নির্বাচন’ কিংবা ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিজয়’ দেখার ধৈর্য নেই। প্রতিটি কেন্দ্র হতে হবে দর্গেু রর্গে মতো সুরক্ষিত,
যেখানে সিসি ক্যামেরা কেবল শোভাবর্ধন করবে না, বরং প্রতিটি জালিয়াতি সরাসরি প্রচার করবে। প্রতিটি
পোলিং এজেন্টের কেন্দ্রে উপস্থিতি বাধ্যতামলকূ করতে হবে এবং যদি কোনো এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে
দেওয়া হয়, তবে ওই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করার সাহস নির্বাচন কমিশনকে দেখাতে হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, যদি ভোটিং ব্যবস্থায় ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং এআই চালিত ভেরিফিকেশন যুক্ত করা যায়,
তবে নির্বাচনী অনিয়ম প্রায় ২৮.৪ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।
শেষ বিচারে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন হবে আমাদের জাতির অস্তিত্বের লড়াই। ৫ই আগস্টের পর জনগণের
প্রত্যাশার পারদ আজ হিমালয়সম উঁচুতে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর এক সাম্প্রতিক জরিপে
দেখা গেছে, ৯২.৩ শতাংশ মানষু বিশ্বাস করেন যে যদি প্রশাসন শতভাগ নিরপেক্ষ থাকে, তবে বাংলাদেশ একটি
বিশ্বমানের নির্বাচন উপহার দিতে পারবে। আমরা চাই এমন এক ভোর, যেখানে প্রতিটি ভোটার বকু ফুলিয়ে
বলতে পারবে—”আমার ভোট আমি দিয়েছি।” বিজয় কি তবে সেই দিনের হবে যেদিন পরাজয় মেনে নেওয়ার
সংস্কৃতি তৈরি হবে আর বিজয়ী প্রার্থী বিনম্র চিত্তে দেশ সেবার শপথ নেবেন? সময় এসেছে ব্যালটের মাধ্যমে সেই
উত্তর দেওয়ার। বাংলাদেশ আর পেছনের দিকে তাকাবে না, আমরা এক সুশঙ্খলৃ ও মর্যাদাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে
বিশ্বকে দেখাতে চাই—আমরা এক সত্যিকারের গণতান্ত্রিক জাতি।
মন্তব্য করুন