
দূষণের ভারে ক্রমেই দমবন্ধ হয়ে আসছে রাজধানী ঢাকা। ধূমপান না করেও শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী সর্দি–কাশিসহ নানা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন নগরবাসী। গত এক মাসে ঢাকার মানুষ একদিনের জন্যও বিশুদ্ধ বাতাস পায়নি—বেশির ভাগ দিনই বাতাসের মান ছিল অস্বাস্থ্যকর কিংবা অতিমাত্রায় দূষিত।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ দিনের মধ্যে ২৪ দিন ঢাকার বাতাস ছিল অস্বাস্থ্যকর এবং ছয় দিন ছিল খুবই অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে। এই সময়ে বাতাসে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম কণা পিএম ২.৫-এর মাত্রা স্বাভাবিক সীমার তুলনায় ১২ থেকে ৩২ গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল। দিনের অধিকাংশ সময় রাজধানীর আকাশ ধুলোর আস্তরণে ঢেকে থাকছে।
এর প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। বাড়িঘরের আসবাবপত্রে জমছে ধুলোর স্তর, আর বাড়ছে শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগীর সংখ্যা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার চার বছর বয়সী ফারিয়া তাবাসসুম এখনই শ্বাসকষ্টে ভুগছে। শীত এলেই ধুলোর কারণে তার শ্বাসের সমস্যা বেড়ে যায়। মাসের পর মাস সর্দি, হাঁচি ও কাশিতে ভোগে সে। রক্তে অ্যালার্জির মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ফারিয়ার মা রওশন আরা বেগম জানান, ধুলোময় পরিবেশে গেলেই মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। সুস্থ হতে অনেক সময় লাগে, কখনো ১০–১৫ দিনের বেশি। চিকিৎসকের পরামর্শে বাইরে বের হলে নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। বয়স অনুযায়ী ওজন হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় শিশুটির শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি ও হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চলের প্রায় একশ কোটি মানুষ বিপজ্জনক মাত্রার দূষিত বাতাসে বসবাস করছে। প্রতিবছর এ দূষণের কারণে লাখো মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছে, পাশাপাশি অঞ্চলটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।
ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে চলাচল করা মানুষও এই দূষণের ভুক্তভোগী। রাইড শেয়ারিং চালক ইসমাইল জানান, মাত্র আধা ঘণ্টা বাইক চালালেই হাত-মুখ কালচে হয়ে যায়। কাপড়ে জমে ধুলো আর কালো ময়লা। বাস বা ট্রাক দ্রুত চলে গেলে চারপাশ মুহূর্তেই ধুলোর মেঘে ঢেকে যায়। মাস্ক পরেও খুব একটা সুরক্ষা মেলে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর বেশির ভাগ সড়কের পাশের গাছের পাতাও ধুলোয় ঢেকে আছে। অনেক জায়গায় নির্মাণসামগ্রী খোলা অবস্থায় রাখা হচ্ছে। বালু পরিবহনে উন্মুক্ত ট্রাক ব্যবহার করা হলেও নেই কার্যকর নজরদারি। কোথাও নিয়মিত পানি ছিটিয়ে ধুলো নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও চোখে পড়েনি।
পরিবেশবিদরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ঢাকার বাতাস আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, নির্মাণকাজে নিয়ম মানা এবং দূষণের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে হবে।
মন্তব্য করুন