ড: তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, এবং দাউদ ইব্রাহিম হাসান
“শোনো হে! ডিজিটাল কার্ড আর জান্নাতের টিকিটের মোহ দেখানো রাজনীতির কারিগররা—তোমরা কি
ভেবেছ ৫ই আগস্টের রক্তস্নাত বিপ্লবের পরও সাধারণ মানুষ সেই পুরনো মরীচিকার পেছনে ছুটবে? না! এই
দেশের প্রতিটি প্রান্তিক মানুষ আজ বুঝে গেছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কোনো আশীর্বাদ ছিল না, ওটি ছিল নাগরিককে
দয়ার শৃঙ্খলে বন্দি করার একহীন রাজনৈতিক কৌশল। আর ধর্মেরর্মে দোহাই দিয়ে ‘জান্নাতের টিকিট’ বিক্রি? ওটি
ছিল স্রেফ পবিত্র বিশ্বাসের ওপর এক চরম ডিজিটাল আঘাত।”
নির্বাচনের ময়দানে যখন কোটি কোটি টাকার প্রোপাগান্ডা চলে, তখন সাধারণ মানুষ ভোটকেন্দ্রের সিসি
ক্যামেরা নয়, বরং তার শূন্য বাজারের ব্যাগের দিকে তাকিয়ে আগামীর ইনসাফ খোঁজে। ২০২৬-এর এই
নির্বাচনে যেই জয়ী হোক না কেন, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কিন্তু কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়,
বরং আসন্ন পবিত্র রমজান ও ঈদলু ফিতর। মানুষ কি প্রথম রোজায় শান্তিতে এক ফালি খেজুর মুখে দিয়ে সেহরি
শেষ করতে পারবে? নাকি সিন্ডিকেটের রাহুগ্রাসে লবণের চেয়েও তেতো হয়ে উঠবে ঈদ? এটাই আজ কোটি
মানুষের নিঃশব্দ আর্তনাদ।”
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কিংবা তথাকথিত ধর্মীয় পুরস্কারের
টোপ দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার যে অপচেষ্টা দেখা গেছে, তা জনগণের আত্মসম্মানকে চরমভাবে লাঞ্ছিত
করেছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে যখন প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জান্নাতের নিশ্চয়তা দেয় কিংবা কার্ডের মাধ্যমে সস্তা
সাহায্যের প্রলোভন দেখায়, তখন তারা আসলে নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে করুণা হিসেবে উপস্থাপন করে।
গ্লোবাল মিডিয়া ওয়াচ ২০২৬ এবং ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (TIB)-এর এক যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী ,
নির্বাচনের আগে ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রায় ৬৪.২% ছিল সম্পূর্ণ অবাস্তব বা তথ্যগতভাবে
বিভ্রান্তিকর। এই পরিসংখ্যানটি নির্দেশ করে যে, অতীতে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ‘কার্ড-নির্ভর’ কল্যাণ
ব্যবস্থা মূলত একটি বিশেষ গোষ্ঠীর অনুগত ভোট ব্যাংক তৈরির সূক্ষ্ম ছক ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ফ্যামিলি কার্ডধারী প্রায় ৩৮.৫% দরিদ্র
মানুষ তাদের রাজনৈতিক পছন্দ প্রকাশ করতে ভয় পেতেন, কারণ কার্ড বাতিলের হুমকি ছিল তাদের মাথার
ওপর ঝুলন্ত খড়গ। কিন্তু ২০২৬-এর এই নতুন বাংলাদেশ আজ সেই জিম্মি দশার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান
করেছে। মানুষ এখন আর দয়া চায় না, তারা চায় মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক অধিকার এবং স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থা।
প্রতিটি ভোটার আজ বুঝতে পেরেছে যে, যে কার্ড তাকে লাইনে দাঁড় করায়, সেই কার্ড আসলে তার স্বাধীনতার
হাতকড়া।
রমজানের প্রথম অগ্নি পরীক্ষা বাংলাদেশের ত্রয়োদশ নির্বাচন। নির্বাচনের ময়দানে যেই জয়ী হোক, তাদের
সিংহাসনে বসার প্রথম সপ্তাহেই মোকাবিলা করতে হবে পবিত্র রমজানের এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। প্রতিবছর
রমজান এলেই একদল অসাধুব্যবসায়ী ‘জড়াজগত’ বা কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি করে বাজারকে অস্থির করে তোলে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (CAB)-এর ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের প্রক্ষেপণ বলছে, যদি
এখনই কঠোর বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করা না হয়, তবে রমজানে খাদ্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি ১৮.৭% ছাড়িয়ে
যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি সাধারণ মানুষের পাতের ভাতের অনিশ্চয়তা।
সাধারণ মানুষের প্রথম রোজার শান্তি নির্ভর করছে সরকারের পেশিশক্তির ওপর নয়, বরং তাদের প্রশাসনিক
সততার ওপর। অক্সফোর্ড ইকোনমিক সিমুলেশন ২০২৬-এর তথ্যমতে, প্রতি বছর সিন্ডিকেটের কারসাজিতে
সাধারণ ক্রেতাদের পকেট থেকে রমজান মাসেই অতিরিক্ত ৪,২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। দেশের
৯৪.৬% মানষু আজ মনে করেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকারের নৈতিক বিজয় নির্ভর করবে তারা এই রাক্ষুসে
সিন্ডিকেট ভাঙতে পারছে কি না তার ওপর। মানুষ চায় প্রথম রোজার ভোরে বাজারের তালিকা দেখে যেন
তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ না পড়ে, বরং একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস তাদের অন্তরকে প্রশান্ত করে। যখন একজন মা
ইফতারের টেবিলে তার সন্তানের মুখে ফল তুলে দেবেন, তখন যেন তাকে মনে মনে দামের হিসাব কষতে না হয়।
পরিবহন নৈরাজ্য ও নাড়ির টানের হাহাকার।ঈদলু ফিতর মানেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য এক
দীর্ঘশ্বাস আর সীমাহীন ভোগান্তির নাম। বিশেষ করে নির্বাচনের ঠিক পরপরই আসা এই ঈদে পরিবহন খাতের
নৈরাজ্য চরমে পৌঁছানোর সম্ভাবনা প্রবল। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (BRTA)-এর সংগৃহীত ডাটা
অনুযায়ী, উৎসবের মৌসুমে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মাধ্যমে যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতিবছর প্রায় ২,৫০০
কোটি টাকা অবৈধভাবে লুটে নেওয়া হয়। এই বিশাল অংকের লুটপাট নির্দেশ করে যে, সাধারণ মানুষ তাদের
নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার পথেও কতটা জিম্মি।
নতুন সরকারের কাছে জনগণের ব্যাকুল প্রত্যাশা হলো, এবার যেন বাড়িতে ফেরার পথটি নির্বাচনি প্রোপাগান্ডা
বা মিথ্যে আশ্বাসের মতো দর্গুমর্গ না হয়। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (NRSC)-এর ২০২৫-এর এক ডাটা
বলছে, অব্যবস্থাপনার কারণে ঈদের ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনার হার প্রতিবছর প্রায় ৩৯.৭% বদ্ধিৃ পায়। মানুষ
এবার এমন এক ঈদ চায় যেখানে প্রতিটি প্রাণ থাকবে সুরক্ষিত এবং যাতায়াতের প্রতিটি পথ হবে মানুষের জন্য
অবারিত। বাড়ি ফেরা যেন যমুদতের সাথে লড়াই না হয়, বরং তা যেন হয় এক পশলা প্রশান্তি।
তারুণ্যের হাহাকার ও আগামীর স্বপ্নের নির্ধারক বাংলাদেশের ত্রয়োদশ নির্বাচন।বাংলাদেশের মানুষের
চোখ এখন কেবল ভোটের ফলাফলে নয়, বরং ভোটের পরের দিনগুলোর বাস্তবতায় নিবদ্ধ। বিশেষ করে
কর্মহীনর্ম তরুণদের কাছে ঈদের আনন্দ এখন নিরানন্দের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইএলও (ILO) এবং বিবিএস
(BBS)-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের শিক্ষিত বেকারত্বের হার এখন ২৭.৮%। এই ডাটাটি
নির্দেশ করে যে, নির্বাচনের ইশতেহারে কর্মসংস্থানের যে বিশাল ফুলঝুরি শোনানো হয়, ঈদ এলে তা শিক্ষিত
যুবকদের হৃদয়ে গভীর রক্তক্ষরণ ঘটায়।
মানুষ আশা করে, নির্বাচনের পর প্রথম রোজাতেই সরকার এমন এক সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেবে যা তাদের স্থায়ী
অর্থনৈতিক মুক্তির নিশ্চয়তা দেবে। গ্লোবাল রিফর্মিস্টর্মি কাউন্সিল ২০২৫-এর তথ্যমতে, যদি বাজার ও পরিবহন
খাতের অব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে বন্ধ করা যায়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে তারল্য প্রবাহ ১২.৪%বদ্ধিৃ পাবে। এই বদ্ধিৃ পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলবে এবং ঈদের বাজারে ক্ষুদ্র
ব্যবসায়ীদের মুখে ও হাসি ফুটাবে। প্রতিটি শিক্ষিত যুবক যেন তার প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে মায়ের জন্য একটি
শাড়ি কিনে বাড়ি ফিরতে পারে, সেই স্বপ্নই আজ জুলাই বিপ্লবের উত্তরাধিকার।
ইনসাফের নবযাত্রায় একটি সুখী সমাজের সূচনা।রাজনীতির চূড়ান্ত সার্থকতা কোনো ডিজিটাল কার্ডের
প্রলোভনে নেই, বরং তা লকিুয়ে আছে মানুষের ভাতের থালা আর পকেটের স্বস্তিতে। মানুষ এখন আর ‘জান্নাতের
টিকিট’ কিংবা কোনো বিশেষ রঙের কার্ডের লাইনে দাঁড়ানো অসম্মানিত বাংলাদেশ চায় না। তারা চায় এমন
এক আধুনিক রাষ্ট্র যেখানে প্রথম রোজার সেহরি থেকে শুরু করে ঈদের সালামি পর্যন্ত সবকিছু হবে আনন্দময়,
স্বচ্ছ এবং সুলভ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৯২.৩% মানুষ মনে করেন
প্রোপাগান্ডা নয়, বরং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সিন্ডিকেট দমনই হবে নতুন সরকারের শ্রেষ্ঠ অর্জন। ২০২৬ সালের
জয়ী পক্ষকে এটা গভীরভাবে বুঝতে হবে যে, ৫ই আগস্টের পর এই দেশের মানুষের চেতনা আজ হিমালয়সম
উঁচুতে। তারা আর কোনো সস্তা মিথ্যে প্রলোভনে ভুলবে না। বিজয় তখনই সার্থক বলে গণ্য হবে, যখন প্রতিটি
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত বাবা তার সন্তানের জন্য হাসিমখেু একটি নতুন জামা কিনে কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়াই বাড়ি
ফিরবেন। ইনসাফের সেই সোনালী ভোরের অপেক্ষায় আজ পুরো বাংলাদেশ প্রহর গুনছে।
মন্তব্য করুন