একজন চিকিৎসকের নেতৃত্বে টানা সেবায় সম্পন্ন হলো ২ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন—তাও কোনো সার্জন ফি ছাড়াই। মানবিক এই অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। রাজধানীর শ্যামলীতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালেই গত মঙ্গলবার সফলভাবে সম্পন্ন হয় দুই হাজারতম কিডনি প্রতিস্থাপন।
সিকেডি হাসপাতাল সূত্র জানায়, কিডনি প্রতিস্থাপনের সময় একসঙ্গে দুটি অপারেশন থিয়েটারে কিডনিদাতা ও গ্রহীতার অস্ত্রোপচার করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে প্রায় ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা। প্রতিদিন একটির বেশি প্রতিস্থাপন সম্ভব হয় না। ১১ জন চিকিৎসকসহ মোট ২১ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ টিম এ কাজে যুক্ত থাকে। ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ২ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে, যার সফলতার হার প্রায় ৯৬ শতাংশ।
অধ্যাপক কামরুল ইসলাম জানান, সপ্তাহে ছয় দিনই তাঁকে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হয়। এরপরও রোগীর চাপ কমে না। অনেক সময় দেখা যায়, শতাধিক রোগী অপেক্ষায় থাকেন। মাসে গড়ে ২৫টি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়, ফলে সবাইকে সেবা দিতে সময় লেগে যায় কয়েক মাস।
বিদেশে কিডনি প্রতিস্থাপনে যেখানে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে অধ্যাপক কামরুল ইসলামের হাসপাতালে সব মিলিয়ে খরচ পড়ে মাত্র ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। এখানেই শেষ নয়—প্রতিস্থাপনের পর রোগীদের ফলোআপ চিকিৎসাও দেওয়া হয় বিনামূল্যে। কোনো ভিজিট ফি বা রোগ নির্ণয়ের ফি নেওয়া হয় না। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য বিনা মূল্যে খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে।
নিজের কাজের বিষয়ে অধ্যাপক কামরুল ইসলাম বলেন, “আমার আয়ও আল্লাহর দান। এক-দুটি ভিজিট না নিলে কিছু আসে যায় না। আমি চাই, যতটুকু পারি রোগীদের কষ্ট আর দুশ্চিন্তা কমাতে। রোগীর উপকার করতে পারলেই আমার কাজটা ইবাদতে পরিণত হয়।”
২০১৪ সালে নিজের সঞ্চয় ও বন্ধুদের সহায়তায় শ্যামলীতে সিকেডি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। শুরু থেকেই ৪০০ টাকা ফিতে রোগী দেখলেও অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে কোনো ভিজিট নেন না। হাসপাতালটিতে বর্তমানে ৪৫০ জনের বেশি কর্মী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২০০ জনের আবাসনের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। পাশাপাশি সব স্টাফ ও ভর্তি রোগীদের জন্য দিনে তিন বেলা বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করা হয়।
অধ্যাপক কামরুল ইসলামের মানবিক মানসিকতার পেছনে রয়েছে তাঁর মায়ের বড় ভূমিকা। তাঁর মা অধ্যাপিকা রহিমা খাতুন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে স্বামীকে হারান। এরপর নিজেই পড়াশোনা চালিয়ে চার সন্তানকে মানুষ করেন। সন্তানের সাফল্য নিয়ে তিনি বলেন, “আমি শুধু চেয়েছি, কামরুল যেন মানুষের সেবা করেই জীবন কাটায়। আল্লাহ যেন ওকে দীর্ঘ হায়াত দেন, শুধু মানুষের উপকারের জন্য।”
মন্তব্য করুন